শাল/চাদর

দেশি কারিগরের হাতে বোনা শাল টেক্কা দেয় কাশ্মিরি শালকে

শীতের হাওয়ায় কাঁধে জড়ালে মনের মধ্যে একটা অচেনা স্নেহ জাগে — সেটা হয়তো কোনো নরম শালেই। শাল শুধু গরম রাখে না; এটি আমাদের ইতিহাস, তাঁতের কারুকার্য এবং গ্রামের নারীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সংস্কৃতির প্রতীক। বহু বছর ধরে আমরা কাশ্মিরি বা বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম শুনে মুগ্ধ হয়েছি, কিন্তু আসলে দেশের ভেতরেই আছে অসাধারণ গুণের শাল। আমরা আমাদের দেশীয় শাল এর গ্রাহক কিন্তু নাম বদলে। বিষয়টা মেনে নিতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য যে দেশে তৈরি অনেক শাল আমরা বিদেশী শাল ভেবেই কিনে এসেছি দিনের পর দিন।

তাছাড়া বাংলাদেশের জামদানী, টাঙ্গাইল, বম, খাদি, বাটিক, ভিসকস, মখমল, রাখাইনদের শাল এবং আরও অনগিনত। এখন সময় এসেছে এই দেশীয় শালগুলোকে নতুন করে চিনবার, ব্যবহার করার এবং বিশ্ববাজারে তুলে ধরার।

শালের ইতিহাস প্রাচীন। চতুর্দশ শতাব্দীর ঘন অকবরে শুরু থেকে শাল বিভিন্ন সভ্যতার পোশাক-সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে। খিলাতের অংশ ছিল শাল; রাজ দরবারে ও সামাজিক আয়োজনে শাল দেওয়া-নেওয়ার রীতি বহু সভ্যতায় প্রচলিত। আমাদের এখানেও কবি-সাহিত্যিকদের ছবিতে শালের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়- রবীন্দ্রনাথের লেখায়ও শালের সৌন্দর্য উল্লেখ আছে। ইতিহাস বলছে শালের সঙ্গে মানুষের সৌন্দর্যবোধ, সম্মান ও আবেগ সবসময় জড়িয়ে আছে।

দেশে নানা অঞ্চলে নানা ধরনের শাল উৎপাদিত হয়। প্রতিটিই আলাদা কাঁচামাল, বুননপ্রণালি ও নকশার ফল। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য:

  • জামদানী শাল: নিখুঁত মোটিফ, সূক্ষ্ম বোনা; GI স্বীকৃতির কারণে বিভিন্ন উৎসবে উচ্চমানের হিসেবে পরিচিত।

  • খাদি শাল: পরিবেশবান্ধব, হস্তচালিত ও ঐতিহ্যবাহী টেক্সচার নিয়ে।

  • খেশ শাল: পুরনো কাপড় পুনর্ব্যবহার করে তৈরি, রিসাইক্লিং ও কাস্টমাইজেশনের সুন্দর উদাহরণ।

  • বম/মান্দি/মরামা/রাখাইন শাল: পাহাড়ি উপজাতিদের স্বতন্ত্র নকশা ও রঙের ভাষা বহন করে।

  • ভিসকস, সিল্ক ও মখমল: ফ্যাশন এবং পার্টি-পরিধানে ব্যবহার উপযোগী লুক দেয়, সিল্ক শাল বালিশে গ্লসি আলো ফেলে অনন্য সুন্দরী লাগে।

  • বাটিক ও টাই-ডাই শাল: হাতের মোম, ব্লক বা টাই-ডাই পদ্ধতিতে তৈরি, প্রতিটি টুকরায় ইউনিক আর্টওয়ার্ক।

টাঙ্গাইল, বগুড়া, নরসিংদী, মধুপুর, মহেশখালী- বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিশেষ ধরনের শাল তৈরি হয় এবং সেখানে তাঁতশিল্প এখনও নানাভাবে বেঁচে আছে।

শাল বানানো সহজ কাজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের নারীরা পরিবার আয় চালানোর দায়িত্ব নিয়ে তাঁত চালান। জামদানীর মতো শালে কয়েক দিন থেকে সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে; কুশি-কাটার বা কোমর তাঁতে সৃষ্ট প্রতিটি নকশা মন দিয়ে বোনা হয়। এই কাজ না থাকলে একেকটা এলাকার অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই শাল কেনা মানে শুধু একটি পণ্য কেনা নয় — সেটা একেকটি পরিবারের রোজগার ও গ্রামের সাহিত্য রক্ষার কাজ।

তবে তথ্য-অভাব, প্রচার-ঘাটতি এবং মাঝে মাঝে অসৎ ব্যবসায়ীরা দেশীয় পণ্যে কাশ্মিরি-ট্যাগ লেবেল লাগিয়ে বিক্রি করে—এসব কারণে গ্রাহকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাঁতীদের মনিটরি ও লজিস্টিক সমর্থনের অভাব আর ই-কমার্সে প্রবেশের সীমাবদ্ধতাও অন্যতম সমস্যা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স ও উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ ধীরে ধীরে বদল আনছে। desi.com.bd বা দেশি’র মত কিছু প্রতিষ্ঠান দেশি শালকে পুরো দেশের মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। GI লেবেল, অথেনটিসিটি সার্টিফিকেটসহ দেশি শাল “দেশি” পৌঁছে দিচ্ছে সবার ঘরে ঘরে।

শাল আমাদের মাত্র একটি উষ্ণ জিনিস নয়; এটি ইতিহাস, কারুশিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতির মিশেল। যদি আমরা দেশীয় শালের প্রতি সচেতনতা বাড়াই, ন্যায্য মূল্য দিই এবং ডিজিটাল চ্যানেলে এগুলোকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করি, তাহলে শাল শুধু আমাদের আলমারিটাই না — বিশ্ববাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে। তাই এই শীতেই একবার চিন্তা করে দেখুন  আপনার পরের শপিং তালিকায় কি একটা দেশি শাল থাকবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *